দ্বীপান্তরের বন্দিনী- বড় প্রশ্নের উত্তর -একাদশ শ্রেণি
দ্বীপান্তরের বন্দিনী
— কাজী নজরুল ইসলাম
1. ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় সমকালীন ভারতবর্ষের যে রাজনৈতিক চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
Ans- কবি কাজী নজরুল ইসলাম জীর্ণ সমাজব্যবস্থার নবসৃজনের প্রচেষ্টার জন্য ‘বিদ্রোহী’ আখ্যা পেয়েছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ সমসাময়িক পটভূমিতে আবির্ভূত নজরুলের রচনা, তাই বারবার সমকালীনতাকে ছুঁয়ে গিয়েছে। গতানুগতিক, অবক্ষয়িত সমাজ ও পরাধীনতার নাগপাশে বন্দি মনুষ্যত্বের বেদনা তাই তাঁর কবিতার প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে।
‘ফণি-মনসা’ কাব্যটির প্রকাশকাল ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ। ইংরেজ শক্তির পদানত ভারতে একদিকে নবীন সমাজ বিপ্লবের কেতন উড়িয়ে সংগ্রামী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে জাতিগত বিভেদকে সামনে রেখে অপর শ্রেণি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের অন্তরায়। ন্যায়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজশক্তি ভারতবর্ষকে কার্যত কয়েদখানায় পরিণত করেছিল।
১৯২০-৩০ এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে উত্তাল হয়েছিল ভারতবর্ষ। সেই আন্দোলন দমন করতে মরিয়া ব্রিটিশ পুলিশবাহিনী বিপ্লবীদের উপর চরম অত্যাচার করতে থাকে। সংগ্রামকে স্তব্ধ করতে তারা বিপ্লবীদের দ্বীপান্তর এবং ফাঁসির নীতি গ্রহণ করে। রক্তাক্ত শতসহস্র বিপ্লবী তবুও অবদমিত হননি। কবি বলেছেন, দমনপীড়নের ভয় দেখিয়ে স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষিত বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রাম থামবে না। কবিতার শেষে তাই তিনি পাপ-বিনাশক যুগান্তরের ধর্মরাজকে আহ্বান করেছেন।
আলোচ্য কবিতাটিতে এভাবে কবি অসামান্য নৈপুণ্যে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী শৃঙ্খলিত ভারতের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ চিত্রায়িত করেছেন।
★★★★★
2. ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় কবির স্বদেশপ্রেম কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে আলোচনা করো।
Ans- কবি নজরুল ইসলামের স্বদেশপ্রেম নিহিত ছিল তাঁর অন্তরের মুক্ত মানবতাবোধে। নজরুল বিশ্বাস করতেন মানববিশ্বে। বিশ্বের কোথাও কোনোখানে মানুষের উপর অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার দেখলেই সরব হত তার লেখনী। পরাধীন ভারতবাসীর বেদনা তাঁর কবিচিত্তকে বিক্ষুব্ধ করত। বিদ্রোহী কবির কলমে তাই উৎসারিত হতো— “কারার ওই লৌহকপাট / ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট” কিংবা “বল বীর / বল উন্নত মম শির”। ইংরেজ শাসনের দেড়শো বছর অতিক্রান্ত ভারতের পটে লেখা পাঠ্য “দ্বীপান্তরের বন্দিনী” কবিতাতেও কবির স্বদেশপ্রেমের উদ্দীপ্ত প্রকাশ ঘটেছে। সামাজিক অন্যায়, বেনিয়ম, শ্রেণিশত্রুদের ভ্রান্ত দর্শন ও প্রকৃত চরিত্র উন্মোচনে এই কবিতা কবির বলিষ্ঠ উচ্চারণ। পাশাপাশি মুক্তিকামী কবি এ কবিতায় “মুক্তভারতী”র স্বপ্নও দেখেছেন। দেখেছেন সামাজিক পটবদলের ইঙ্গিত (‘পদ্মে রেখেছে চরণপদ্ম যুগান্তরের ধর্মরাজ?’)।
বাকস্বাধীনতা হারিয়েছে ভারতবাসী। পাঠ্য কাব্যউপমায় ভারতী বাগদেবীই তাই দ্বীপান্তরিত। পুণ্যবেদির শূন্যে আজ শুধু ক্রন্দন ধ্বনিত হয়। রক্ষপুরী তুল্য ইংরেজ সাম্রাজ্য ষড়যন্ত্রী ইংরেজ সান্ত্রীদের প্রহরায় রেখেছে ভারতের সন্তানদের। বন্দিনী তাই বাণীও। নজরুল সেই বন্দিত্ব মোচনের স্বপ্ন দেখেন। পরাধীন সমাজের বুকে “নূতনের কেতন” ওড়ার স্বপ্ন দেখেন। একদিকে ব্রিটিশের সুতীব্র অত্যাচার—
“আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক
সত্য বলিলে বন্দী হই,...”
কিংবা,— ‘সিংহের ভয়ে রাখে পিঞ্জরে
ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল’
অন্যদিকে অন্তঃসারশূন্য স্বদেশপ্রেমিকদের ছদ্মশৌখিন দেশপ্রেম। কবির ভাষায় তারা শৌখিন পূজারি। আশাবাদী কবি তবু দেখেছেন বাণীর কন্ঠ শতভাবে রোধ করতে চাইলেও বিধির বেতারমন্ত্র বেজে ওঠা। রক্তাক্ত অত্যাচারিত, আবদ্ধ সমাজেই যুগান্তরের ধর্মরাজের আগমন বার্তা। মুক্তিকামী কবি খুঁজে পেয়েছেন পরাধীনতার থেকে মুক্তির সম্ভাবনা। তাই উচ্চারণ করেছেন—
“দ্বীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক”।
See More - বিশাল ডানাওয়ালা এক থুরথুরে বুড়ো- প্রশ্ন উত্তর
★★★★★
3. ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় উত্থাপিত প্রশ্নগুলির মধ্য দিয়ে পরাধীন দেশের জন্য আর্তি ও তজ্জনিত কবির হতাশা কীভাবে ফুটে উঠেছে? এই পীড়ন ও নৈরাশ্য কি কবি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন?
Ans- পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী কবি নজরুল ইসলাম। ‘স্বাধীনতা হীনতায়’ বেঁচে থাকার সুতীব্র যন্ত্রণাতে তিনি যথার্থ দেশপ্রেমীদের মতো রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। দেড়শত বছরের দাসত্বের ইতিহাসে কেবল শাসকের রক্তচক্ষু, বঞ্চনা আর নিরবচ্ছিন্ন শোষণে দেশমাতৃকার সম্মান ভূলুণ্ঠিত, যেন দ্বীপান্তরের নির্বাসনে নির্বাসিত। ভারতমাতার সুসন্তানেরা, যারা মায়ের এই লাঞ্ছনা, দুঃখ দূরীকরণে উৎসর্গীকৃত, সেই সংগ্রামী কণ্ঠ আজ আন্দামানের কারাগারে বন্দি। অন্যদিকে ভন্ড দেশপ্রেমীদের লোক-দেখানো দেশভক্তি কবিপ্রাণকে ব্যতীত করেছে, তাঁকে হতাশ করেছে। আর তাই সেই হতাশার প্রতিবাদে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে ‘রক্তে লেখা’।
• এই হতাশা সত্ত্বেও কবি আশাবাদী। তিনি মহাকালের শাশ্বত সত্যকে বিশ্বাস করেন, বিধির বিধানে মুক্তির স্বপ্ন দেখেন। কবির বিশ্বাস অনন্ত কালপ্রবাহের রীতিতে মুক্ত হবে ভারতবর্ষ। কবি জানেন শাসকের পাপের বোঝা পূর্ণ হলে তার পতন অনিবার্য। রাজশক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নতুন প্রাণের গান সূচিত হবে, নতুন ভারতবর্ষ জেগে উঠবে। এই বোধে ঋদ্ধ কবি ‘যুগান্তরের ধর্মরাজের’ পদধ্বনি শুনেছেন, বিধির বেতারমন্ত্রে ‘শিকল ভাঙার গান’ শুনেছেন।
★★★★★
4. ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কে? ‘বন্দিনী’-কে মুক্ত করার জন্য কবির যে আকুলতা প্রকাশিত হয়েছে, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।
Ans- বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় ‘বন্দিনী’ বলতে কবি পরাধীন ভারতবর্ষকে বুঝিয়েছেন।
• কবি নজরুল ইসলাম পাঠ্য কবিতায় পরাধীন ভারতবর্ষের বিপর্যস্ত অবস্থার কথা প্রকাশ করেছেন। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ভয়াবহ, নগ্ন, লালসাগ্রস্ত রূপটি তুলে ধরে ভারতবাসীর সকরুন অবস্থার চিত্রায়নে তিনি বলেছেন ভারতের তরুণ বিপ্লবীরা আজ দ্বীপান্তরে আবদ্ধ।
ইংরেজ শাসকদের নির্মম শোষণে ভারতবাসীর জীবন তমসাচ্ছন্ন। স্বদেশপ্রেমে দীক্ষিত যুবকরা সত্যের পথে চলে আজ দ্বীপান্তরিত, নয়তো নিহিত। এই ভয়াবহতা থেকে কবিতায় এসেছে মুক্তির আকুলতা। ব্যক্তিজীবনে অত্যাচার ও শোষণে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও কবি মাথা নত করেননি, সামাজিক পটভূমিতে তিনি শুনেছেন বীণার সেতারে বিধির বেতারমন্ত্র, বহু প্রতীক্ষিত ‘মুক্ত-বন্ধ-সুর’। এই সুর ভারতের মুক্তির বার্তা এনেছে, কবির মনে হয়েছে ধর্মরাজ সমাগত, মুক্তিকামনায় তাই কবি কায়মনোবাক্যে উচ্চারণ করেছেন ‘ঢাক অঞ্জলি,/ বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ’। তাঁর বিশ্বাস এমন আঘাতে ধ্বংস হবে ইংরেজদের বানানো রক্ষপুর এবং মুক্তি পাবে বন্দি ভারত।
★★★★★
5. ‘মা’র কতদিন দ্বীপান্তর’— ‘মা’-কে? তিনি কেন দ্বীপান্তরিত?
Ans- মানবতাবাদী কাজী নজরুল ইসলামের ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ (মূলগ্রন্থ : ‘ফণিমনসা’) কবিতায় মা বলতে পরাধীনা, শৃঙ্খলিতা দেশমাতৃকাকে বোঝানো হয়েছে।
• নজরুল কবিতায় কারাজীবনের চিত্র, কারাগার, কারাপ্রতীক, বন্দিত্বের রূপকার্থ বারবার ফুটে উঠেছে। স্বদেশপ্রেমের তীব্র উত্তেজনায় তিনি কখনও উচ্চারণ করেছেন—
‘কারার ওই লৌহকপাট / ভেঙে ফেল কররে লোপাট’
কখনও বলেছেন— ‘শিকল পরার ছল / মোদের এই শিকল পরা ছল’। পাঠ্য কবিতাতেও পরাধীনা দেশমাতার চিত্রায়নে তিনি এনেছেন দ্বীপান্তরের কথা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে বিগত দেড়শো বছর ভারত পরাধীন। শাসকের দমনপীড়ননীতির চূড়ান্ত রূপ দ্বীপান্তর। শাসকের স্বার্থপূরণে আইন ন্যায়ের শাসক। দেশমাতৃকার মুক্তিকামী সন্তানরা আবদ্ধ। স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করলেই দণ্ডপ্রাপ্তি। এই বাস্তবতার রূপায়ণ পাঠ্য কবিতা। ভারতমাতা পাঠ্য কবিতায় ভারতী বা বাগদেবীর প্রতিকার্থে উপস্থিত। বাকদেবীও আজ শৃঙ্খলিত, পরাধীন। বিগত দেড়শো বছর ধরে কারান্তরালে দেশমাতার প্রকৃত অধিষ্ঠান সন্তানদের হৃদয়মন্দিরে। মুক্তিকামী সন্তানরা কালা-আইনের ফাঁদে রুদ্ধ, দ্বীপান্তরিত। তাই দেশমাতাও প্রতীকার্থে আজ দ্বীপান্তরিত।
‘আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী
মার কতদিন দ্বীপান্তর?
পুণ্যবেদির শূন্যে ধ্বনিল
ক্রন্দন— ‘দেড় শত বছর”।
★★★★★
6. ‘শতদল যেথা শতধা ভিন্ন
শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়’— মন্তব্যটি তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। এই পরিস্থিতিতে কবি কীসের প্রত্যাশা করেছেন?
Ans- বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম রচিত ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশশক্তির অত্যাচারে পরাধীন ভারতবাসী, ভারতবর্ষের পীড়িত অবস্থার কথা বোঝানো হয়েছে।
শতদল শব্দের অর্থ হল পদ্ম। এই পদ্ম বাগদেবী সরস্বতীর অধিষ্ঠানক্ষেত্র। ইংরেজ শাসনের নগ্ন অত্যাচার পরাধীন ভারতবাসীদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। সত্য উচ্চারণের অপরাধে তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকদের রচনা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, তরুণ বিপ্লবীদের শাস্তিস্বরূপ কারাগারে বন্দি করা হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের করাল গ্রাস সত্যকে হরণ করে সৌন্দর্যকে বিক্ষত করে। তাই ‘শস্ত্র-পাণির অস্ত্র’ অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনদণ্ডের আঘাতে সারস্বতচর্চার এই অবক্ষয়কে উদ্ধৃতাংশে ব্যঞ্জিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাগদেবীর অধিষ্ঠানের এই টালমাটাল অবস্থাকে ইঙ্গিত করে সত্যসাধনার অবরুদ্ধ অবস্থাকে প্রকাশ করা হয়েছে।
• দেশের সংকটে একরাশ হতাশা যখন ঘিরে ধরেছে পরাধীন ভারতবাসীকে, তখন আশাবাদী কবি এই সীমাহীন শোষনের পরিবেশেই নবজীবন ধর্মের প্রবর্তক ধর্মরাজের আগমন প্রত্যাশা করেছেন। কবি বিশ্বাস করেন শোষণ যখন মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠে, তখন তার থেকে জন্ম নেয় প্রতিবাদ। বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত প্রতিবাদী ভারতবাসী যুগপরিবর্তন করবে এমনই প্রত্যাশা করেন কবি।
★★★★★
7. ‘ধ্বংস হল কি রক্ষ-পুর?’— ‘রক্ষ-পুর’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কীভাবে তা ধ্বংস হবে?
Ans- বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতাংশটি গৃহীত। কবি ‘রক্ষ-পুর’ বলতে ‘দ্বীপান্তরের আন্দামান’-এর সেলুলার জেল এবং ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র ভারতকে বুঝিয়েছেন।
• ব্রিটিশ সরকার তার কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করে পরাধীন ভারতবাসীর প্রতিবাদের কন্ঠরোধ করেছিল। রাজশক্তির অতন্দ্র পাহারায় বন্দি ছিল নবীন প্রাণের মুক্তচেতনা। আবার, অন্যদিকে পরাধীন ভারতীয়দের অধিকার খর্ব করে ইংরেজরা সমগ্র ভারত জুড়েই বানিয়েছিল রাক্ষসপুরী, ‘রক্ষ-পুর’। সাম্যবাদী কবি নজরুল ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে যন্ত্রণায় মর্মাহত হয়েও আশা রাখেন তরুণ প্রজন্মের উপর, ভারতবাসীর একতার উপর। তার বিশ্বাস জাতি-ধর্মের অসাম্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ সাহসী নবীন প্রজন্ম জীবনমৃত্যুর ভয়কে তুচ্ছ করতে পারলেই ইংরেজদের রক্ষঃপুর ধ্বংস হবে। তাদের সংগ্রামে প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিপক্ষ অবশ্যই পরাজিত হবে। আশাবাদী কবি আলোচ্য কবিতার শেষে তাই যুগ পরিবর্তনের জন্য ‘যুগান্তরের ধর্মরাজ’কে আহ্বান জানান। ইংরেজদের মাত্রাহীন শোষণই ভারতবাসীকে শিখিয়ে দেবে প্রতিবাদের ভাষা। সে পথেই বদলে যাবে দেড়শত বছরের ধারণা। জীবন সম্পর্কে সে বিশ্বাসই পরাধীনতার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার আলোয় পৌঁছে দেবে ভারতবাসীকে।
★★★★★
8. ‘কামান গোলার সিসা-স্তূপে কি
উঠেছে বাণীর শিশ-মহল?’— ‘কামান গোলার সিসা-স্তূপ’ কী? ‘বাণীর শিশ-মহল’ বলতে কবি কী বোঝান? কামান গোলার স্তূপে ‘বাণীর শিশ-মহল’ কীভাবে উঠবে?
Ans- কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ফণি-মনসা’ কাব্যের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে নেওয়া আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে ‘কামান গোলার সিসা-স্তূপ’ বলতে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রের প্রাচুর্যকে বোঝানো হয়েছে।
• ‘শিশ-মহল’ শব্দের অর্থ কাচনির্মিতপ্রাসাদ, যা শৌখিন এবং সুন্দর। বাণী শব্দের অর্থ বাগদেবী আবার অন্য অর্থে সত্য। আলোচ্য কবিতায় কবি ‘বাণীর শিশ-মহল’ বলতে আন্দামানে বন্দি মুক্তিপ্রত্যাশী ভারতের বিপ্লবীদের সত্যের প্রাসাদচূড়াসম শীর্ষস্থানে অবস্থানকে বুঝিয়েছেন।
• সুদীর্ঘ দেড়শো বছর ইংরেজ শাসকরা ভয় দেখিয়ে, শাসন-শোষণের মাধ্যমে ভারতবাসীকে পদানত করে রেখেছে। তবে অত্যাচার যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে তখনই কালের নিয়মে নেমে এসেছে প্রতিবাদ। ভারতমাতার শৃঙ্খলমোচনের গুরুভার কাঁধে তুলে নিয়েছে দেশের বীরসন্তানরা। ইংরেজদের থেকে কামান গোলা-বারুদ লুণ্ঠন করে তারা সেগুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সশস্ত্র প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছে। তারা বুঝেছে ইংরেজদের অন্ধ অনুসরণে ভারতবাসীর মুক্তি নেই, মুক্তি আছে স্বাধীনতায়। তাদের এই সত্য উপলব্ধিই তাদের বিপ্লবী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেছে, তাই তারা ভয় পায়নি মৃত্যুকে, ভয় পাইনি দ্বীপান্তরকে। এভাবেই তারা কামান-গোলার মাধ্যমে ‘বাণীর শিশ-মহল’ অর্থাৎ স্বাধীনতার সত্যভাবনা রচনা করেছে।
★★★★★
9. ‘রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এই রক্তাক্ত অধ্যায় কীভাবে সমাপ্ত হতে পারে বলে কবি আশা করেছেন?
Ans- কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় ‘রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব’ বলতে রক্তস্নাত খুনখারাবি তথা হত্যালীলার কথা বলা হয়েছে। ব্রিটিশশক্তির আগ্রাসী দমনপীড়ননীতি পরাধীন ভারতবর্ষের বহু বীর বিপ্লবীর প্রাণ নিয়েছিল, রক্তস্নাত হয়েছিল পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ।
• ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগর সন্তান সংঘ আয়োজিত সরস্বতী পূজার উদবোধনী অনুষ্ঠানের জন্য কবি আলোচ্য কবিতাটি রচনা করেছিলেন। কবিতায় কবি নজরুল সময়ের প্রেক্ষিতে বাণী বন্দনার প্রয়োজনহীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে অন্তঃসারশূন্য বাণীবন্দনা সময়ের পটভূমিতে বেমানান। তৎকালীন সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্মম অত্যাচারে ভারতবাসী বিপর্যস্ত। প্রতিবাদীদের কন্ঠরোধ করতে দ্বীপান্তর কিংবা ফাঁসি ছিল মূল অস্ত্র। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাকস্বাধীনতার অধিকার, কবি-সাহিত্যিকদের স্বাধীন সৃষ্টির অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
আশাবাদী কবি সমসাময়িক সংকটময় পরিস্থিতিতেও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি দেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস মাত্রাতিরিক্ত শাসনই মুক্তির বার্তা আনবে। বন্দি ভারতবাসী বদ্ধতা থেকে চেতনাকে জাগিয়ে ঐক্যবদ্ধতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করবে। তার জন্য মেকি বাণীবন্দনা নয়, প্রয়োজন ভারতবাসীর হতাশাকে প্রত্যাশায় পরিণত করার ক্ষমতা, যা প্রতিরোধ গড়ে তুলে রক্তাক্ত পর্বের অবসান ঘটাবে।
★★★★★
10. ‘তবে এ কিসের আর্ত আরতি / কিসের তরে এ শঙ্খারাব?’ — ‘আরতি’ ও ‘শঙ্খারাব’ কীসের জন্য? তা আর্ত কেন? কবি এই প্রশ্ন কার উদ্দেশ্যে কেন তুলেছেন?
Ans- কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ফণি-মনসা’ কাব্যের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে সংগৃহীত উদ্ধৃতাংশে আপাত অর্থে ‘আরতি’ ও ‘শঙ্খারাব’ অর্থাৎ শঙ্খের ধ্বনি তোলা হয়েছিল চন্দননগর সন্তান সংঘ আয়োজিত সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে বাগদেবীর আরাধনায়। প্রকৃত অর্থে কবি বাকস্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত, ইংরেজ শক্তির কাছে অত্যাচারিত পরাধীন ভারতবাসীর বাণী আরাধনার মেকি আয়োজন ও আড়ম্ভরকে বুঝিয়েছেন।
• ‘আরতি’ বলতে ধূপ, দীপ ইত্যাদি দ্বারা দেবদেবীর বরণকে বোঝায়। আলোচ্য কবিতায় কবি বাণীবন্দনার আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরের মাঝে পরাধীন ভারতবাসীর বন্দিত্বের যন্ত্রণাকেই বড়ো করে দেখিয়েছেন। যদিও ভক্তির মধ্যেই একটা স্বাভাবিক আর্তি থাকে; কিন্তু তৎকালীন সমাজ পরিস্থিতিতে সেই স্বাভাবিকতাকেই কবির নিছক আনুষ্ঠানিকতা বলে মনে হয়েছে। যখন ইংরেজ শক্তির শোষণ-পীড়নে রক্তাক্ত হয়েছে ভারতবাসী, সত্য বলার অপরাধে যখন নির্বিচারে বন্দি হয়েছে কবির সাহিত্যিক সহ বহু বিপ্লবী, ঔপনিবেশিক শাসন যখন কেড়ে নিয়েছে তাদের বাকস্বাধীনতার অধিকার, তখন দেবী সরস্বতীর প্রাণহীন মূর্তিপূজার আরতিতে আর্তের যন্ত্রণা মিশে থাকাই স্বাভাবিক বলে মনে করেছেন কবি। তাই কবি এসব আয়োজন অপ্রয়োজন বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
• উদ্ধৃতাংশে কবি আপাত অর্থে চন্দননগর সন্তান সংঘের প্রতিনিধি, যারা উত্তাল সময়পর্বে বাণীবন্দনার আয়োজন করেছিল, তাদের নির্দেশ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কবির এ প্রশ্ন ভন্ড দেশপ্রেমিকদের উদ্দেশে। কারণ কারাগারে বন্দিদের মুক্তির মধ্য দিয়ে, পরাধীন ভারতবাসীর বাকস্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত সরস্বতী আরাধনার প্রেক্ষিত রচিত হবে। নাহলে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
★★★★★
11. ‘জীবন-চুয়ানো সেই ঘানি হতে
আরতির তেল এনেছ কি?’— কোন ঘানি? তা ‘জীবন চুয়ানো’ কেন? ‘আরতির তেল’ রূপকটি ব্যাখ্যা করো। ‘আরতির তেল’ কেন প্রয়োজন?
Ans- ‘ঘানি’ শব্দের অর্থ তৈলবীজ পেষণযন্ত্র, যা থেকে তেল নিষ্কাশিত হয়। কবি নজরুল ইসলামের ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতার অন্তর্গত আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে ‘ঘানি’ বলতে বোঝানো হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকারের নির্মম শাসন তথা শোষণযন্ত্রকে।
• ইংরেজ সরকার ‘ঘানি’ অর্থাৎ শোষণ যন্ত্রস্বরূপ গড়ে তুলেছিল আন্দামানের ‘সেলুলার জেল’। সেখানে বন্দি ভারতবাসীর উপর অকথ্য লাঞ্ছনা ও পীড়ন চলত, যার ফলে জীবনীশক্তি নিঃশেষিত হয়ে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ত। তাই আন্দামানের কারাগারকে কবি ‘জীবন-চুয়ানো’ বলেছেন।
• ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগর সন্তান সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে লিখিত এ কবিতায় ‘আরতির তেল’ বলতে সাধারণ অর্থে পূজার উপকরণকে বোঝানো হলেও রূপকার্থে নজরুল এই শব্দবন্ধটির দ্বারা ভারতের বিপ্লবী সন্তানদের উৎসর্গীকৃত প্রাণশক্তিকে বুঝিয়েছেন।
• ভারতের বীর বিদ্রোহীরা যখন ইংরেজদের অত্যাচারে পীড়িত, তখন ভারতবর্ষে মহাড়ম্বরে সরস্বতীর পূজাকে নজরুল বাতুলতা বলে মনে করেছেন। যে ঔপনিবেশিক শাসন বাকস্বাধীনতার অধিকার থেকে ভারতবাসীকে বঞ্চিত করেছে, সত্য বলার অপরাধে কবি-সাহিত্যিকদের বন্দি করেছে, সেখানে বাণীপূজা অর্থহীন। কবির বিশ্বাস, নিজেকে দগ্ধ করে দেশপ্রেমিকরা দেশের পূজায় মগ্ন, তাদের অসহনীয় জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে, স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়েই রচিত হবে প্রকৃত সরস্বতী আরাধনার প্রেক্ষিত, যেখানে অনিবার্য আরতির তেলের ন্যায় বিপ্লবীদের প্রাণশক্তি।
★★★★★
12. ‘হায় শৌখিন পূজারি’— ‘পূজারি’ কে? তাকে ‘শৌখিন’ বলা হয়েছে কেন?
Ans- কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় আদর্শহীন, ভন্ড দেশপ্রেমিকদের ‘শৌখিন পূজারি’ বলে উল্লেখ করেছেন কবি।
• দেড়শো বছরের পুঞ্জিভূত পরাধীনতার গ্লানি দূর করতে তৎপর দেশনায়করা মাতৃভূমির ডাকে আত্মবলিদানেও পিছপা হয়নি। তাদের সংগ্রাম, প্রতিবাদকে নিঃশেষ করতে ব্রিটিশ শাসক দ্বীপান্তরে নির্বাসিত করে, কারারুদ্ধ করে ফাঁসির পন্থা অবলম্বন করে; বাকস্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয় পরাধীন ভারতবাসীর। এই অস্থির সময়ে উঠে আসে একদল স্বার্থান্বেষী মানুষ, দেশভক্তির মুখোশধারী এসব মানুষ ছিল রাজশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন। মোহাবিষ্ট ভাষণে এসমস্ত দেশনেতারা পরাধীন হতাশাগ্রস্ত মানুষদের কেবলই ছলনাই করেছিল। তারা দেশের হিতার্থে তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ বা স্বার্থত্যাগ করেনি। এই কারণে কবি এদের ‘শৌখিন পূজারি’ বলেছেন। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য এরা কোনোকালেই উদগ্রীব ছিলেন না, বরং আত্মসুখই এদের পরমাকাঙ্ক্ষিত। কবির মতে, এই শ্রেণির মানুষ কখনও দেশমাতৃকার প্রকৃত পূজারি হতে পারে না। নজরুল কাব্যিক ভঙ্গিমায় এদের ধিক্কার জানিয়েছেন, সোচ্চার প্রতিবাদে এদের ছদ্মবেশ খুলে দিয়েছেন।
13. ‘সিংহেরে ভয়ে রাখে পিঞ্জরে,/ ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল’,— ‘সিংহ’ ও ‘ব্যাঘ্র’ কারা? কারা তাদের পীড়ন করছে? ‘পিঞ্জর’ ও ‘অগ্নি-শেল’ কী?
Ans- কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে ‘সিংহ’ ও ‘ব্যাঘ্র’ বলতে পরাধীন ভারতবর্ষের সাহসী-তরুণ, দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের একনিষ্ঠ কান্ডারি বীর-বিপ্লবীদের বোঝানো হয়েছে।
• তাদের পীড়ন করছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশশক্তি। বিপ্লবী নেতাদের বন্দি করে ও হত্যা করে স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তিমিত করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশ সরকার এই পীঠন করেছে।
• ‘পিঞ্জর’ কথাটির অর্থ হল খাঁচা। আলোচ্য কবিতায় ‘পিঞ্জর’ বলতে কবি ‘সপ্ত সিন্ধু তেরো নদী পার’ ‘দ্বীপান্তরের আন্দামান’-এ নির্মিত ইংরেজদের শোষনযন্ত্র ‘সেলুলার জেল’কে বুঝিয়েছেন। সেখানে নির্বিচারে বন্দি করা হয়েছে ভারতের সারস্বত সাধনার, বৈপ্লবিক চেতনার অধিকারী বহু পরাক্রমশালী সন্তানকে। কবিতায় ‘অগ্নি-শেল’ বলতে নজরুল ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশদের ব্যবহৃত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রকে বুঝিয়েছেন। এমনই প্রচুর আধুনিক অস্ত্রের আশ্রয়ে ইংরেজরা সাম্রাজ্যবিস্তার ও অন্য জাতির উপর আধিপত্য বহাল রেখেছিল।
★★★★★
14. ‘পদ্মে রেখেছে চরণ-পদ্ম / যুগান্তরের ধর্মরাজ?’— প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
Ans- বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য কবিতায় কবি দেশমাতৃকার শৃঙ্খল-মোচনের জন্য পরাধীন ভারতবাসীর হৃত বিশ্বাসকে, সংগ্রামী মানসিকতাকে আহ্বান করেছেন। কবিতায় তিনি আন্দামানের জেলে বিপ্লবীদের কারাবাসের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথে উত্তরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। উপরোক্ত উদ্ধৃতিটিও সেই মুক্তির ইঙ্গিত বহন করেছে।
নজরুল আলোচ্য কবিতায় যে ধর্মরাজের কথা বলেছেন, তিনি মৃত্যুর দেবতা নন, নবসৃষ্টির দেবতা। যে যুগের সঙ্গে নজরুলের কবিতা লগ্ন হয়ে থেকেছে, সে যুগ পরাধীন ভারতবাসীর অত্যাচারের, যন্ত্রনার যুগ। এই যুগযন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার যুগ প্রবর্তন করার লক্ষ্যে নজরুল আহ্বান জানান বিমূর্ত ধর্মরাজকে। যিনি ফিরিয়ে আনবেন পরাধীন ভারতবাসীর বাকস্বাধীনতার অধিকার, যার হাত ধরে মুক্তি ঘটবে বন্দি কবি-সাহিত্যিক ও বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত ভারতসন্তানদের। কবি জানেন ব্রিটিশশক্তির মাত্রাহীন শোষনের পথ ধরেই যুগপরিবর্তনের কান্ডারি ধর্মরাজের আগমন ঘটবে; যিনি শ্বেতপদ্মাসনা সরস্বতীর মতোই সত্যের তথা শান্তির বাতাবরণ নির্মাণ করবেন ভারতবর্ষে। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল উন্মোচিত হবে তাঁরই চরণপদ্মের স্পর্শে। বলাবাহুল্য, এ ধর্মরাজ প্রকৃতপক্ষে অত্যাচারিত ভারতবাসীর প্রতিবাদী সত্তা, নবীন সমাজ যে অধর্মের বিনাশ করে ধর্ম প্রবর্তন করবে।
★★★★★
15. ‘ঢাক’, অঞ্জলি, / বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ!’— ‘পাঞ্চজন্য’ কী? ‘অঞ্জলি’ কার জন্য? ‘অঞ্জলি’ ঢেকে ‘পাঞ্চজন্য’ বাজানোর উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে কেন?
Ans- ‘পাঞ্চজন্য’ হল কৃষ্ণের শঙ্খ, পঞ্চজন নামক দৈত্যের অস্থি দিয়ে তা তৈরি।
• ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় আপাত অর্থে ‘অঞ্জলি’ বাগদেবী সরস্বতীর জন্য। প্রকৃতপক্ষে কবি নজরুল ইসলাম দেশমাতৃকার উদ্দেশ্যে অঞ্জলির কথা বলেছেন।
• চন্দননগর সন্তান সংঘের আয়োজিত (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ) সরস্বতী পূজার উদবোধন অনুষ্ঠানে পাঠ করার জন্য রচিত ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় কবি তৎকালীন সমাজ-রাজনৈতিক পরিবেশে বাণীবন্দনার আড়ম্বরকে প্রয়োজনহীন বলে মনে করেছেন। যে সময় ব্রিটিশশক্তির নির্মম অত্যাচারে রক্তাক্ত হয়েছে বহু ভারতবাসী, সত্য বলার অপরাধে বন্দি হয়েছে কবি-সাহিত্যিক-সহ দেশমাতৃকার বৈপ্লবিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ, ঔপনিবেশিক শক্তি কেড়ে নিয়েছে পরাধীন ভারতবাসীর বাকস্বাধীনতার অধিকার, তখন বাণী দেবীর প্রাণহীন মূর্তিপূজার আনুষ্ঠানিকতাকে কবি ব্যঙ্গ করেছেন। ভারতবাসীর জীবনের যে সুর দ্বীপান্তরের আন্দামানে বন্ধ হয়ে আছে, তার মুক্তির মধ্য দিয়েই দেশে প্রকৃত সরস্বতী পূজার প্রেক্ষিত রচিত হবে বলে কবির বিশ্বাস। তাই যুগপরিবর্তনের জন্য তিনি ‘ধর্মরাজ’-কে আহ্বান জানান। কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে সত্যধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য, কৃষ্ণ যেমন পাঞ্চজন্যের মধ্য দিয়ে আহ্বান জানিয়েছিলেন, কবি নজরুল তেমনই বাণী অঞ্জলির আড়ম্বর ভুলে ব্রিটিশ সরকারের মাত্রাহীন শোষনের পথ ধরেই যুগপরিবর্তনের কান্ডারি নবজীবন ধর্মের প্রবর্তক ধর্মরাজকে আহ্বান জানান। আহ্বান জানান পীড়িত-লাঞ্ছিত-অপমানিত ভারতবাসীর অন্তর্নিহিত শক্তি ও সাহসকে, সামর্থ্য ও প্রত্যাশাকে।
★★★★★
16. ‘দ্বীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে / যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক’— ‘দ্বীপান্তরের ঘূর্ণিপাক’ কথাটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
Ans- আলোচ্য অংশটি কবি নজরুল ইসলামের ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতা থেকে সংকলিত হয়েছে। এ কবিতায় উঠে এসেছে নির্যাতিত মানুষের যন্ত্রণা, পরাধীন জাতির আর্তি ও শাসকের অন্যায় অত্যাচারবিরোধী প্রতিবাদ।
আলোচ্য কবিতায় কবি আন্দামানের সেলুলার জেলে কীভাবে ব্রিটিশশক্তির শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা সংগ্রাম নির্মমভাবে অবদমিত হয়েছে, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়েছে তা ব্যক্ত করেছেন। হতাশাগ্রস্ত সময়ে দাঁড়িয়ে আশাবাদী কবি দেখেছেন যুগপরিবর্তনের স্বপ্ন। তাঁর বিশ্বাস স্বাধীনতার সূর্য উদিত হবে অত্যাচারের পথ ধরেই। এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত পঙক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্রিটিশ রাজশক্তির পাশবিক দমননীতিতে সমগ্র ভারতবর্ষ রক্ষপুরে পরিণত হয়েছে, ভারতবাসী তাতে বন্দি। কবি নজরুল এই পরিস্থিতিতে আহ্বান করেছেন যুগপরিবর্তনের কান্ডারিকে, যিনি ধর্মের প্রবর্তক। কৃষ্ণের পাঞ্চজন্য যেমন করে সত্য-ধর্ম প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়েছিল, কবিও সেই শঙ্খধ্বনিতে ধর্মরাজের আগমনবার্তা জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির মুক্তি ঘটবে, দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচন হবে। কাব্যিক ভঙ্গিমায় তাই তিনি বলেছেন, দ্বীপান্তরের যূপকাষ্ঠে যুগপরিবর্তনের বার্তা ধ্বনিত হয়েছে। এভাবেই নিরসন হবে দেড়শো বছরের পরাধীনতা।
★★★★★
17. ‘বাণীর কমল খাটিবে জেল!’— ‘বাণীর কমল’ শব্দটির অর্থ কী? কেন সে জেল খাটবে?
Ans- দেশমাতৃকার যেসব সন্তান সত্যের পূজারি, ‘ভারত-ভারতী’-র উপাসক, সেইসব ভারত সন্তানদের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে ‘বাণীর কমল’ রূপকে চিহ্নিত করেছেন কবি।
• ঔপনিবেশিক শাসনপর্বে ব্রিটিশ রাজশক্তির দ্বারা ভারতবর্ষ দেড়শো বছর ধরে অত্যাচারিত হয়ে এসেছে। ইংরেজ বাহিনীর এই নির্যাতন মেনে না নিয়ে যারাই প্রতিবাদ করেছে, সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, তাদেরই ‘বিদ্রোহী’ আখ্যায় কারারুদ্ধ হতে হয়েছে। প্রতিবাদ তীব্র হলে সেলুলার জেলে দ্বীপান্তর বাপ ফাঁসির শাস্তি জুটেছে তাদের। কবিতায় কবি বিপ্লবীদের দ্বীপান্তরে কারাবাসের কথা, বাকস্বাধীনতা হারানোর কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, কবিতায় উঠে এসেছে কবির ব্যক্তিগত জীবন। রাজদ্রোহের দায়ে একসময় নজরুলও কারাবন্দি হয়েছিলেন, বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তাঁর কাব্য। সত্যভাষণের ভয়ংকর ফলাফলে কবি বারবার ব্যথিত হয়েছেন। ন্যায়ের রক্ষক আইন এখানে ‘সত্য’কেই জেলের অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। সেই কারণে কবি বানীর কমল জেল খাটবে বলে মনে করেছেন।
Post a Comment