বাংলা বিষয়ের সমস্ত উত্তর পাওয়া যাবে

সোনার তরী কবিতার বড় প্রশ্ন- কলেজের ছাত্রদের জন্য

 


প্রশ্ন: ‘সোনার তরী’ কবিতার প্রাকৃতিক চিত্রের বর্ণনা দাও।৫

উত্তর-বাংলাদেশের পদ্মার বুকের ওপরে বাস করার সময়ই নিবিড় প্রকৃতি প্রীতিতে রবীন্দ্রনাথ তন্ময় হয়ে যেতেন। তখন প্রকৃতির যে সৌন্দর্য তিনি উপভোগ করেছেন তারই প্রকাশ ঘটেছে সমগ্র ‘সোনার তরী কাব্যে। উক্ত কাব্যের প্রথম কাব্যের প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের সুখ-দুঃখকে এক সূত্রে গেঁথে উপলব্ধি করলেন।

     এ কবিতার প্রথম পঙক্তিতেই দেখা যাচ্ছে; বর্ষাকালের আকাশে মেঘ গর্জন হচ্ছে ; ঘন বর্ষার একটি প্রাকৃতিক চিত্র যার মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে এক অজানিত বেদনার সুর।বর্ষাকালীন পদ্মার তীরে স্রোত যে ধারাল খড়্গের মতো খরস্রোতা—প্রকৃতির কুলে বর্ষাকালীন নদীর এক অপূর্ব চিত্র।

     তারপরেই দেখা যাচ্ছে প্রকৃতির ভোরের পরিবেশে গ্রামের চিত্র।সকালের আবছা আলোয় গাছপালায় ঢাকা অন্য পারের গ্রামের চিত্র। এ ছবিটা রহস্যঘেরা স্বপ্নময় চিত্ররস উপভোগ করার মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য।বর্ষার প্রাকৃতিক চিত্র এখানে মিশে গিয়েছে কবির উপলব্ধ ভাবানুভূতি প্রথম স্তবকে বর্ষার প্রাকৃতিক চিত্রের দিনটির সূচনা পর্ব আর শেষ স্তবকে কবি জীবন নদীর কূলে দাঁড়িয়ে একটি বর্ষণক্লান্ত অপরাহ্নে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জড়িয়ে রয়েছে।সর্বশেষে বলা যায় কবি বর্ষার চিত্ররূপময় প্রাকৃতির বর্ণনার মাধ্যমে আমাদের চিত্তকে এক অনিৰ্দেশ্য সৌন্দর্য লোকে পৌঁছে দিয়েছেন।

প্রশ্ন : কবি ‘সোনার তরী’র মাঝির কাছে যা আবেদন করেছিলেন তা মাঝি রেখেছিলেন কী ? ৫

উত্তর- পদ্মার ওপর বর্ষার প্রকৃতিতে কবি যখন মত্ত হয়েছিলেন তখন কবি দূরে দেখতে পেলেন একটি তরী বেয়ে গান গাইতে গাইতে কে যেন এ পারে আসছে—সে কোনো দিকে না তাকিয়ে পাল-তোলা নৌকায় ভেসে যাচ্ছে। কবি তার পরিচয় নিয়ে সংশয়ে আছেন। কবি তাকে ব্যাকুল কণ্ঠে আহ্বান করলেন, সে যেন একবার কবির কাছে এসে তীরে নৌকা ভেড়ায়। অচেনা সেই মাঝি কবির ডাকে সাড়া দিয়ে কবির কাছে এল ; কবির অনুরোধে তাঁর মাঝি কবির সঞ্চিত সোনার ধান তার নৌকায় তুলে নেয়। কবি তাঁর সমগ্র জীবনে নদী-তীরে বসে যত সোনার ধান আহরণ করেছিলেন ওই বিদেশি মাঝির নৌকাতে সমস্তটাই তুলে দিয়ে কাতর আবেদন জানালেন নৌকাতে কবিকেও তুলে নেওয়ার জন্য। যেন একটু জায়গা করে দেওয়া হয় কবির জন্য।

      কিন্তু কবির কাতর প্রার্থনা পূর্ণ হল না। মাঝি স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন কবির শেষ অনুরোধে মাঝি কর্ণপাত করলেন না—কারণ তরীতে আর জাগয়া নেই, কবির সোনার ধানেই ছোটো তরী বোঝাই হয়ে গিয়েছে। অতএব কবিকে তরীতে স্থান দেবার উপায় ছিল না। শূন্য নদীর তীরে একলা পড়ে রইলেন কবি। কবির সোনার ফসল তুলে নিয়ে মাঝি নৌকা নিয়ে চলে গেল কবিকে পিছনে ফেলে রেখে এখানেই কবির মানসিক সত্তাটি প্রকাশ পেয়েছে এক করুণ আর্তিতে। তিনিও চান তাঁর সোনার ফসলের মতো সংসার তরণীতে তার স্থান হবে। তাঁর বড়ো আশা ছিল ফসলের সঙ্গে সংসার তাকেও গ্রহণ করুক। সুতরাং কবির কাতর আবেদন প্রত্যাখান হল।

প্রশ্ন: 'যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী'—এই পঙক্তির তাৎপর্য নির্ণয় করো। ৫

উত্তর- কবি সমগ্র জীবনে যা কিছু কাব্য সৃষ্টি করেছিলেন তা সোনার তরীতে ভরে দিয়ে বিশ্বজনের উদ্দেশে নিবেদন করে জীবন নদীর কূলে দাঁড়িয়ে একটি বর্ষণক্রান্ত অপরাহ্নে নিঃসঙ্গ কবির মানবিক সত্তাটি সংসারের এই অকৃতজ্ঞাতায় গুমরে গুমরে উঠল। সংসারের এই তস্করবৃত্তিকে তিনি কোনো ভাবেই গ্রহণ করতে পারলেন না। কবির মনে হল তিনি আজ নিঃস্ব, দানহীন। কারণ তাঁর সৃষ্টির ওপর থেকে তাঁর স্বত্ব আলগা হয়ে যাবার জন্য তিনি বেদনা অনুভব করছেন। তাঁর এই ব্যথাতুর আত্মার মর্মভেদী দীর্ঘশ্বাস বিশ্বের সর্বহারা সংসারের স্বৈরচারের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে হয়ে গেল একাকার। এ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কার কাছে মানুষ নালিশ জানাবে? কিন্তু মানুষ জানে না সংসারের এটা অত্যাচার নয়, করুণা। দশজনের আদরেই কবির আনন্দ। সোনার তরীর মাঝি আদর সহকারেই কবির সৃষ্টি তুলে নিয়েছে বলেই কবি প্রথমে আনন্দ পেয়েছিল। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে বিচ্ছেদে কবিতার শেষে বেদনার সুর ধ্বনিত হয়।

        মানুষ তার সৃষ্টির চেয়েও মহৎ। তারায় তারায় তার নিমন্ত্রণ। বোঝা তাকে হালকা করতেই হবে। সংসার এই ভাবেই মানুষের বোঝা হালকা করে—এ না হলে মানুষ আর মানুষ থাকত না ; সে হয়ে যেত যক্ষ—যে কেবল ধরনের রক্ষক ভক্ষক নয়। তার ধন তাই তার শত্রু; কারণ সে চলার গতিকে বদ্ধ করে রেখেছে। সে একটা সমাধি ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু মানুষ একটা সমাধি হতে পারে না। বিশ্বের কল্যাণে নিজেকে সমর্পিত হতে হয় তাকে। এইখানেই তার স্বার্থকতা তাই সবকিছু বিলিয়ে দিয়েই সে ধনী—ঋণী সে কারও নিকট নয়। যক্ষবৃত্তি তার নয় বলেই সে মুক্ত আত্মা। কারণ তাঁর অপার কাব্য-সৃষ্টি ‘সোনার তরী’তে তুলে দিয়েই কবির আত্মাভিমান চরিতার্থ হল।

প্রশ্ন: 'সোনার তরী' কবিতার নামকরণ কি যুক্তিযুক্ত? 

উত্তর - ‘সোনার তরী' কবিতার নামকরণ প্রসঙ্গে আলোচনার প্রাক্কালে তার রূপকার্য নির্ণয় অবশ্য করণীয়। এই কবিতাতে কৃষক, চাষ, চাষ জমি বা ছোটো খেত, খেতের চারিদিকে বাঁকা জলের খেলা, | সোনার ধান, অকস্মাৎ গান গাইতে আসা নাবিক, সোনার তরী, সোনার তরীতে ধান তুলে দেওয়া, তরীতে স্থান গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার এক ভাবগত অর্থ আছে।

     কৃষক এখানে কবি। চাষ হচ্ছে কাব্য সৃষ্টির চেষ্টা। চাষ জমি বা ছোটো খেত হল, কবির জীবন বৃত্ত, সীমিত কর্মক্ষেত্র। বাঁকা জলে ঘেরা ছোটো খেত নানা প্রকার বাধা-বিঘ্ন প্রতি-কূলতায় বেষ্টিত কবির জীবন- -বৃত্ত বা কর্মভূমি। সোনার ধান কবির কাব্য সাধনার শ্রেষ্ঠফল, শ্রেষ্ঠ কাব্য সম্ভার। খরপরশা ভরানদীতে গান গাইতে গাইতে আসা তরণীর নাবিক হলেন তরঙ্গসংকুল কালপ্রবাহে অক্লেশে পারে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম কবির জীবন-পরিচালক, জীবন দেবতা। সোনার তরী হল ভয়াল কাল প্রবাহে কবির | শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে, কাব্য সম্ভারকে উত্তীর্ণ করে দেওয়ার, এককাল থেকে অন্যকালে নিয়ে যাওয়ার অখিল বিশ্বের সহৃদয় পাঠক কুলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরাপদ আশ্রয় ও উপায়—অর্থাৎ কালজয়ী অমরত্বের উপায়। যা ভয়াল জলধি বা তরঙ্গিনী স্রোতস্বিনীকে তরণ ও উত্তরণ করে তা তরী বা তরণী। এ তরণী কাষ্ঠ নির্মিত নয়, নয় লৌহাদি মলিন বর্ণের অল্প মূল্যের ধাতু নির্মিত। অতি মূল্যবান সকল মানুষের আদরণীয়, শোভন বর্ণে সমুজ্জ্বল সুবর্ণে নির্মিত এ তরী সোনার তরী। যেমন কাল নদী তেমনি তার শক্তিধর নাবিক। যেমন নাবিক তেমনি তার তরণী। সমগ্র বিশ্ব ভুবন কবির কাব্যকে স্থান দেয় হৃদয়ে পরম আদরে, কাব্য হয়ে থাকে অমর কিন্তু সেই কবিব্যক্তিকে, তার অহংকে স্থান দেয় না। কবিও চান তাঁর কাব্য সাধনা লাভ করুক অবিনশ্বর মহিমা। যাঁর প্রেরণায় কবির কাব্য রচনা, সেই কবিজীবননিয়ামক কাল প্রবাহে তরীর নাবিককে কবি স্বেচ্ছায়, সাগ্রহে তাঁর যাবতীয় সাহিত্য সৃষ্টি কালজয়ী করার উদ্দেশ্য তুলে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ক্ষণকালের দুর্বলতায় কবি নিজেকেও কালপ্রবাহ বিজয়িনী তরণীতে চেয়েছিলেন তুলে দিতে, নিজ সৃষ্টির মতো নিজেকেও দিতে চেয়েছিলেন অমরতা। কিন্তু কবিকে স্থান দিলেন না নাবিক। কবিকে পড়ে থাকতে হল আপন কর্মক্ষেত্রে। একে কবি তাঁর সর্বস্ব, তাঁর প্রাণের ধন কাব্য সমাহারকে তুলে দিয়ে আপন সৃষ্টি থেকে বিচ্ছেদের বেদনা বোধ করেছেন, তার ওপর একলা কর্মক্ষেত্রে পড়ে থাকার এক নৈরাশ্য মিশ্রিত বিষাদ তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। কবি বুঝতে পেরেছেন কাব্য সম্পদ এবং ব্যক্তিসত্ত্বা এক নয়, তাই তাঁকে পড়ে থাকতে হয়েছে তাঁর কর্মক্ষেত্রে ; জীবন দেবতা চান তিনি আরও কিছু সৃষ্টি করুন তাঁর জীবন বৃত্তের সীমিত গন্ডিতে।

     'সোনার তরী’ কাব্যের ‘ঝুলন’, ‘দুই পাখি’ প্রকৃতি কবিতায় subjectivity বা মন্ময়ভাবনা যে দৃঢ়ভাবে প্রকাশিত সে কথা বলা বাহুল্য। আঘাত-সংঘাত, আলোড়ন-আন্দোলনে সুখাবেশ বিবশ কবিব্যক্তিত্বের জাগরণ ‘ঝুলন' কবিতায় যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে ‘দুই পাখি’ কবিতার মুক্ত প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতি আবদ্ধ করে প্রাণের আকর্ষণ। ‘বসুন্ধরা’ ‘মানস সুন্দরী’, ‘সমুদ্রের প্রতি’ কবিতাবলিতে নদ-নদী জলধির বিচিত্র রূপ, পদ্মা-তীরস্থ সাধারণ মানুষের বাসভূমি ও জীবনযাত্রা, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, মধ্যদিবস-মধ্যরাত্রি, বনবনানীর শ্যামলিমা, আকাশের নীলিমা, বাতাসের মুক্ত প্রবাহ মাটির তুচ্ছ নগণ্য ধুলো-বালি, ঘাসের গন্ধ ইত্যাদির প্রতি কবি প্রাণের গভীর মমত্ব প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব প্রকৃতির জন্য অসীম সৌন্দর্যের জন্য কবির আকাঙ্ক্ষা তীব্র ভাবানুভূতির মূর্ত হয়ে উঠেছে ‘সোনার তরী’-র এই এই কবিতায়। ‘পরশপাথর’ কবিতায় পৃথিবীর নগণ্যকে ফেলে দিয়ে স্পর্শমণি পরশপাথর খোঁজার ব্যর্থতা প্রকাশ করে। ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায় পিতার প্রতি ক্ষুদ্র বালিকার স্নেহাকর্ষণ প্রকাশ করে ‘বৈষ্ণুব কবিতা’য় দেবত্ব ও মানবত্বের সমতা প্রকাশ করে, রবীন্দ্রনাথ মর্ত্যভূমির জন্য তাঁর মমত্বের‘ সোনার পরিচয় রেখেছেন। এ সবই রোমান্টিক কবি মানসের পরিচয়বাহী।

‘সোনার তরী’ কবিতায় একখানি ছোটো খেত আমি একেলা প্রভৃতি পঙ্ক্তিতে যে চিত্র ধর্মিতা আছে, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রায়’ ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার কূলে দিনের চিতা' প্রভৃতি পঙ্ক্তিতে, ‘বসুন্ধরা’য় ‘পদ্মার পশ্চিম পারে সুদূর আকাশে' ইত্যাদিতে সেই একই চিত্র ধর্মিতা বর্তমান।

শ্রুতি-সুখদ ছন্দ ও শব্দাদির প্রয়োগে এবং পরিমিত আয়তনে ‘ঝুলন’ ‘পরশ পাথর’ ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা' প্রভৃতি কবিতা গীতি কাব্যত্বের গঠন-আঙ্গিকে প্রথম কবিতা সোনার তরী সমধর্ম বিশিষ্ট। ‘সোনার তরী’, কবিতাতে কাব্যগত বিবিধ বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটেছে। তাই মনে করতে পারি কবিতাটির নামেই কাব্যটির নামকরণ।

প্রশ্ন:‘সোনার তরী' কবিতাটির তাৎপর্য কী সংক্ষেপে আলোচনা করো। 

অথবা, সোনার তরী কবিতাটির মর্মার্থ নিজের ভাষায় ব্যক্ত করো।

অথবা, সোনার তরী কবিতাটির মর্মবাণী উদ্ঘাটিত করো। 

উত্তর- সৃষ্টি আর স্রষ্টা এদের মধ্যে কে বড়ো, কার দাম বেশি কর্মের, না, কর্মীর—এই নিয়ে মানুষের ভাবনাচিন্তার আর শেষ নেই। মানুষ বলে আমিই প্রধান; আমার কর্ম অপ্রধান। কারণ, আমার কর্ম আমার অধীন। আমি না থাকলে কে কাজ করত ? অর্থাৎ জগৎসংসার যদি আমার কর্মের ফল গ্রহণ করে তাহলে তাকে প্রথম গ্রহণ করতে হবে আমাকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেন, তা নয়। বিশ্বের লক্ষ কোটি কর্মবীরের আজীবন কর্মের সাধনার কত ফসলই না আমরা ভোগ করছি; কিন্তু ক'জন কর্মবীরকে আমরা মনে রাখি ? তাছাড়া মানুষের কাজই তো কর্ম করা। মানুষ যদি দম্ভের ভরে নিজেকেই বড়ো করে দেখে তাহলে তার দম্ভ চূর্ণ হতে বাধ্য। সংসার তার তরণীতে কর্মে ফসলগুলিই তুলে নেয়; মানুষকে প্রত্যাখ্যান করে। তাছাড়া মানুষ তার কর্মের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে বসে থাকতে পারে কি ? না, পারে না। কারণ সে তার 'সৃষ্টির চেয়ে মহৎ'। আর মহৎ বলেই সে নিতান্ত উদাসীনভাবেই বলে, ‘এক হাটে লও বোঝা, শূন্য করে দাও অন্য হাটে।

       রবীন্দ্রনাথ তাঁর আজীবন সাধনার সোনার ফসল প্রায় অচেনা সোনার তরীর ওপর নার তরীর ওপর তুলে দিয়ে শূন্য নদীর তীরে একলা বসে রইলেন। প্রত্যেক মানুষই তো একা ও নিঃসঙ্গ। আমরা প্রতিটি মানুষই যে পৃথক। কাছের মানুষও আমাদের কাছ থেকে অনেক যোজন দূরে। কথাটা হয়তো সত্য; কিন্তু আজীবন ধরে সাধনা করে আমরা যে ফসল সঞ্চয় করি তাকে অপরের হাতে তুলে দিতে সত্যিই কি আমাদের মন ব্যথাতুর হয় না? তবে, মহাকাল যে উদাসীন। তার স্রোতে সোনার ফসলই ভেসে যায়; মানুষ আটকে থাকে চড়ায়। মহাকাল তাই সোনার ফসল নিয়ে উধাও হয়ে যায়, পড়ে-থাকা মানুষের আর্তিতে শূন্য নদীর চর মর্মরিত হয়ে ওঠে। তার করুণ আবেদনে সাড়া দেয় না কেউ। রবীন্দ্রনাথ অন্য এক জায়গায় তাই বলেছেন—'...কাজ করিতে করিতে, ফসল জমা হইতে হইতে এমন দিন আসিয়া পড়ে যখন বুঝিতে পারি, এ ফসল আমি কোথাও লইয়া যাইতে পারিব না। এ সমস্তই আমাকে দিয়া যাইতে হইবে। কাহাকে দিয়া যাইব? যাহাকে চিনি এবং চিনি না, যে আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে, কিন্তু ধরা দেয় নাই। তাহাকে আমি বলি—'ওগো, তুমি আমার সব লও এবং আমাকেও লও। সে আমার সব লয়, কিন্তু আমাকে লয় না— ''সোনার তরী' কবিতাটিতে সেই কথাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। আমার যা আছে সবই তুমি নাও, কিন্তু সেই সঙ্গে আমাকেও তুমি করুণা তরে তুলে নাও। কিন্তু সোনার তরণীতে অত স্থান নেই। কবিকে তাই সোনার তরীর মাঝিটি অর্থাৎ মহাকাল উদাসীনভাবেই প্রত্যাখ্যান করে গেল।


 


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.