বাংলা বিষয়ের সমস্ত উত্তর পাওয়া যাবে

কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার প্রশ্ন উত্তর - BA 1st SEmester

 কাণ্ডারী হুঁশিয়ার 

প্রশ্ন : ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় কাণ্ডারী ও যাত্রীরা কীসের প্রতীক?


 উত্তর : বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাণ্ডারী হুঁশিয়ার শীর্ষক কবিতা থেকে আলোচ্য উদ্ধতাংশটি নেওয়া হয়েছে। পংক্তিটির দ্বারা মুসলিম জাতির পরাধীনতা ও দুর্যোগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

    এখানে জাতির কর্ণধার অর্থাৎ পথপ্রদর্শককে প্রতীক রূপে ‘কাণ্ডারী’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। দুর্গম যাত্রাপথে কাণ্ডারীকে প্রশ্ন করেছে যাত্রীরা। পথ চলতে চলতে আর শেষ না হওয়ায় যাত্রীরা শঙ্কিত তারা কোথাও কোনো কূল-কিনারা দেখতে পাচ্ছে না। এমনকি এতটুকু আশার আলো আকাশে চাঁদ, তাও মেঘে ঢাকা। তাই যাত্রীরা কাণ্ডারীকে প্রশ্নটি করেছে। মূলত প্রশ্নকারীরা হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষমান জনতা, যারা একটা শঙ্কা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে।

প্রশ্ন : কোন পটভূমিতে কবি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা রচনা করেছিলেন তা বর্ণনা করো।

উত্তর : ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিল তখন কাজী নজরুল ইসলাম ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। ভারতবর্ষ সুদীর্ঘ দেড়শত বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। পরাধীন ভারতবর্ষের শ্রমজীবী নিরীহ সাধারণ মানুষের উপর কুখ্যাত ব্রিটিশদের অত্যাচার উৎপীড়নের বিরুদ্ধে কবি প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল পরাধীন ভারতবর্ষের কবি। পরাধীনতার জ্বালা তিনি মনে মনে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা লাভের জন্য বিদেশী শাষকের প্রতি বিদ্রোহ, তীব্র ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। সে সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বীর বিপ্লবীদের বিনা বিচারে ফাঁসির মঞ্চে ফাঁসি দিচ্ছিল। সে অবস্থায় দেশের নেতাদের মধ্যেও মানসিক ফারাক দেখা দেয়। অহিংস ও সহিংস আন্দোলনের পক্ষে দেশের নেতারা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া নেতাদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয়ের অভাব দেখা দেয়। নিরীহ দেশবাসী পীড়নে কাতর ছিল। তারা বুঝতে পারছিল না কীভাবে তাদের মুক্তি আসবে। এমতাবস্থায় কবি দেশনেতাদের উদ্দীপ্ত করার জন্য রূপকাশ্রয়ে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি রচনা করেছেন।



প্রশ্ন : “ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান”—তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।


উত্তর : সাম্যবাদের জয় ঘোষণাকারী কবি নজরুল ইসলামের ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার অংশ।

     ভারত ভূমির কঠিন শৃঙ্খলাকে মুক্ত করাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একমাত্র লক্ষ্য। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করেছে তাদের সেই বিচারে অনেকেরই ফাঁসি হয়েছে। তারা জীবনের জয়গান গেয়েছেন। পরাধীনতার কবল থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রধানত ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম করবার সুমহান দায়িত্ব পালন করেছে। স্বাধীন করার এই সংগ্রামী মনোভাবকে কবি জীবনের জয়গান বলেছেন।


প্রশ্ন : “অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ।”—জাতি অসহায় কেন? তারা ডুবে মরছে কেন?

উত্তর : সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন এই কবিতা লিখছেন তখন দেড়শতাধিক বৎসর ইংরেজদের শাসনের অধীনে চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে সমগ্র ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষের সমস্ত রকম অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে অত্যাচারী ইংরেজরা। সে কারণেই জাতির অগ্রগতির পথে শৈবাল দামের মিছিল দেখে কবি এই জাতিকে অসহায় জাতি বলেছেন।

এই অসহায় জাতি পরাধীনতার অতল সলিলে ডুবে মরছে। আত্মমুক্তির সুযোগ অবরুদ্ধ হওয়ায় কবি জাতিকে ডুবে মরার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কৃপণ, স্বার্থপর, আত্মসুখমগ্ন পরপদলেহী ইত্যাদি হীন চরিত্রের মানুষে সমাজ ভরে গিয়েছে। সেকারণেই কবির মনে হয়েছে, যে জাতি কোন না কোন কিছুর জন্য নিজে সত্তাকে বিক্রি করে দেয় সে জাতি নিঃশব্দে ডুবে মরছে।


প্রশ্ন : “ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার”—উদ্ধৃতাংশটি কোন কবিতার? কবি কাদের, কোন পথে সাথে নেবার কথা বলেছেন? উত্তর : উদ্ধৃতাংশটি কাজী নজরুল ইসলামের “সর্বহারা” কাব্যগ্রন্থের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ নামক কবিতা থেকে নেওয়া।

স্বাধীনতা জাত ধর্ম নির্বিশেষে সকলেরই প্রাপ্য, সকলেরই প্রিয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকার নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। কিন্তু সমাজ এখনও এই কুসংস্কারজনিত বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। জাতিগত বিভাজন সৃষ্টি করে যাদের আমরা দূরে সরিয়ে রেখেছি তাদের মনে জমা হয়েছে অব্যক্ত ব্যথা, পুঞ্জীভূত হয়েছে ক্ষোভ। স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অধিকার তাদেরও আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শর্তই হলো এক মজবুত জাতীয় ঐক্য। তাই স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ সৈনিকদের কাছে কবির অনুরোধ যাদের আমরা ব্রাত্য করে রেখেছি তাদেরও এই যুদ্ধে সাথে নিতে হবে, তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। সবাইকে এগিয়ে চলার মন্ত্রে উজ্জীবিত করলে তবেই এই সংগ্রাম সঠিক দিশা পাবে।


প্রশ্ন : “আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ”—তাৎপর্য ব্যাখ্যা

করো।

উত্তর--ধর্মের নাম নিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে বহু নিরর্থক সংস্কারের আধিপত্য ঘটলে শক্তিক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। এতে ধর্মের ভ্রষ্টতা এবং আচারের অত্যাচািরপরায়ণ অন্যায়ের রূপটাই ফুটে ওঠে। মিথ্যা ধর্ম-বিশ্বাসের অভিঘাতে সমাজ শত খন্ডে ভেঙে পড়ে, ঈশ্বরের নামে মানুষ মানুষকে করে তোলে অশুচি ও অপাঙক্তেয়। এ কারণেই দেখি আচারের বেড়া গেঁথে যে বহু সংখ্যক মানুষকে আমরা দূরে সরিয়েছি তাদের দুর্বলতা এবং মূঢ়তা, তাদের আত্মাবমাননা সমগ্র দেশের উপর চেপে তাকে অকৃতার্থ করে রেখেছে সুদীর্ঘকাল। সকলের মধ্যে আত্মার সম্বন্ধ স্বীকার করার মতন সামগ্রিক দৃষ্টিটাকেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তার ফলে জাতীয় সত্তা শতধা বিভক্ত হয়ে আমাদের দুরবস্থাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। জাত-পাত, ধর্মের বিকার যে কতটা য়াবহ তা ভারতবাসী বুঝতে পারলেও তারা ভীষণভাবেই অসহায়। ধর্মের এই অন্ধত্ব, বাঁধা নিয়ম, শুচিতা ও কৃত্রিম গণ্ডিতে পড়ে মানুষের মন অসাড় হয়ে যায়। সে তখন নিত্যধর্ম অর্থাৎ সত্যকে মেনে নিতে দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু যিনি জানেন মুক্তোর হদিশ তার কাছে ঝিনুক যেমন আকর্ষণীয় নয় তেমনই ধর্মের খোলসের ভেতর থেকে সারসত্যের সন্ধান যারা পেয়েছেন তারা ঠুনকো আচার সংস্কার পরিত্যাগ করেন। কুসংস্কারের কাছে ধর্ম প্রাথমিকভাবে পরাজিত হয় কারণ আগাছার মতো অন্ধ সংস্কারেরও একটা জোর আছে। আপনি বেড়ে ওঠে, তার জন্য চাষাবাদের দরকার হয় না; সহজে মরতেও চায় না। অথচ বিশুদ্ধ জ্ঞানের ও ধর্মের উৎকর্ষের জন্য নিরন্তর সাধনা চাই। মানুষের মনুষ্যত্ব সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য্যে নয়, আচারের অনুষ্ঠানেও নয়, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ আছে এই সত্যেই সে সত্য। আর এই সত্য থেকে ধর্ম যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা নেই। জাতির সংকট আসে, সে বিপদাপন্ন হয়, পরাধীনতাকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। জাতের এসব বালাই নেই। সে আত্মকেন্দ্রিকতায় ভুগতে থাকা স্বার্থপর একটি পরিচয়। একজন দেশপ্রেমিক সততই জাতিকে অগ্রাধিকার দেবে, জাতকে নয়। তবুও স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্ণধারের কাছে কবি সংশয়াকুল হয়ে জানতে চান দেশের বিপদে জাতিকে রক্ষা করা আশু কর্তব্য না জাতকে।


প্রশ্ন:‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায় নজরুলের দেশপ্রেম সম্পর্কে আলোচনা করো। (১০)


উত্তর : আমাদের দেশ বহুকাল ছিল পরাধীন। এই পরাধীনতার বিরুদ্ধে এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন তাঁরই দেশপ্রেমিক বলে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এবং যারা পরাধীনতার বা বিদেশি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহিত্য রচনা করেছেন তাঁরও দেশপ্রেমিক আখ্যা পেয়েছেন। অতএব এ থেকে বলা যায় যে, রাষ্ট্রীয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াইটা হচ্ছে দেশাত্মবোধ বা স্বদেশপ্রেম। কিন্তু এটাই সব পরিচয় নয, কারণ পরাধীনতা তো শুধু একটি বিষয়েই নয়, মানুষ তার অভিষ্ঠ লাভের পথে এগিয়ে চলতে চায়, কিন্তু পথে কত বাধা। অনেক বাধা তার নিজেরই সৃষ্টি।

    কবি নজরুল ভারতীয়। ভারতবর্ষই হল তাঁর দেশজননী। জন্মের পরেই দেখেছেন দেশজননীর মুক্তির জন্য কত শত বিপ্লবীর দল প্রাণ দিয়েছেন প্রাণ দেওয়ার জন্যে আরও কত বিপ্লবী দল তৈরি হয়ে আছে। তখন মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে এদেশে শুরু হয়ে গেছে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। কবি গান্ধিজির অহিংস নীতির প্রতি প্রথম আস্থাশীল ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে গান্ধিজির অহিংস আন্দোলনকে অসার বলে মনে করেন। তাই তিনি এইরূপে শান্তির বাণী আর চরকার সুতা কাটার প্রতি বিশ্বাস রাখলেন না। ‘আমার কৈফিয়ৎ' কবিতায় তিনি সরাসরি গান্ধি বিরোধিতা করেছেন—কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পরোক্ষভাবে যখন তিনি বলেন—

"এল কোটি টাকা এল না স্বরাজ! 

টাকা দিতে নারে ভুখারী সমাজ

মার বুক হতে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি বাঘ খাওহে ঘাস। 

হেরিনু জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ।।"

 তখন আর তিনি গান্ধিজির অহিংসা নীতির পথ না বেছে সাম্যবাদের সশস্ত্র বিপ্লবের পথে পা বাড়ালেন। সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়েই দেশজননীর মুক্তি আসতে পারে। তাই তিনি সেই সব যুবকদের আহ্বান জানালেন, যারা একদিন চরকায় সুতা কেটে মিথ্যার তাঁত বুনে চলেছিল—

‘জাগোরে জোয়ান! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি।”


 কবি নজরুল সশস্ত্র বিপ্লবের মন্ত্রে সকল ভারতবাসীকে দীক্ষা দেন। তাদের সকলের কাছে একান্ত কাম্য হবে দেশজননীর মুক্তি। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে আহ্বান করেছেন, তাদের কাছে জাতি ধর্ম বড়ো নয়, বরং জাতপাতের বৈষম, ভুলে গিয়ে মাতৃমুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।কবির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আসবে। দেশের প্রতি কবির ভালোবাসা ছিল অগাধ, দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি এমন করে বলতে পেরেছিলেন—

"ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর।

উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।।”


ব্রিটিশের সঙ্গে আপোসের রাজনীতি তিনি পছন্দ করতেন না। শোষক ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল প্রতিবাদের সুর শোনা যায়। একটা জাতি যখন বহুদিনের পরাধীনতায় নিবীর্য হয়ে পড়েছে, নিজের শক্তিতে শ্রদ্ধা নেই, নিজের স্বাধীন ইচ্ছা নামক কোনো অনুভূতি নেই, তখন তার কানেই তো আত্মবিশ্বাসের মন্ত্র ধ্বনিত করা সবচেয়ে আগে দরকার। একাজ করতে গিয়ে কবি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার যে কত বড়ো পরিচয় দিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।আমাদের দেশ ও জাতির পরম দুর্ভাগ্য, কবিকণ্ঠ দীর্ঘকাল স্তব্ধ, ভাষাহীন থেকে গেছে। যিনি এই দীর্ঘকাল বঙ্গবাসীকে অকৃপণ দানে সম্পন্ন করতে পারতেন, দুর্দিনে দেশ ও জাতিকে কল্যাণের পথের নির্দেশ দিতে পারতেন, তাঁর এই নীরবতা গভীর বেদনাদায়ক সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাই বোধহয় কবি নজরুলের জীবনের দুর্লঙ্ঘ নিয়তি, তবে আমাদের সান্ত্বনা এই যে, নজরুলের সাহিত্য সাধনা দীর্ঘকালব্যাপী না হলেও তাঁর দানের পরিমাণ নিতান্ত অল্প নয়। যদি তাঁর রচনাসম্ভার থেকে নতুন করে মনুষত্বের প্রেরণা ও দেশাত্ম প্রেমের মন্ত্র লাভ করে এবং যুগসংকট হতে পরিত্রাণ লাভের চেষ্টা করি, তবেই তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন আপামর পাঠক শ্রেণির কাছে।

প্রশ্ন : কবি মুক্তিকামী কাণ্ডারীকে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন তা বর্ণনা করো।

উত্তর : নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কবির এক অন্যতম কবিতা। সুদীর্ঘ দেড়শত বৎসর ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। কুখ্যাত ব্রিটিশ সরকার পরাধীন ভারতের নিরীহ শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের উপর যে অকথ্য অত্যাচার, উৎপীড়ন, জুলুম চালিয়েছিল তার প্রতিবাদস্বরূপ আলোচ্য কবিতাটি প্রতিবাদ রূপে চিহ্নিত হয়েছে।

   কবি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কাণ্ডারীকে কতকগুলি সাবধানতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কবি বলেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনাকালে নানারকম বাধা বিপত্তি আসবে, সেই সব বাধা বিপত্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কবির ভাষায়-

“কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।

এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।” 


মাঝপথে ঝড়, তুফানে মাঝি দিকভ্রষ্ট, পথভ্রষ্ট হতে পারে মাঝি অর্থাৎ কাণ্ডারীকে তা ঠিক করে নিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে হবে। চলার পথে কোনো যাত্রী অর্থাৎ আন্দোলনকারী সংশয়ের সম্মুখীন হয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে ওই সন্দিগ্ধ ব্যক্তির সন্দেহের অবসান ঘটাতে হবে। কখনো কখনো— 

“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”


হিন্দু ও মুসলমানের পরিচিতির অবতারণা করে কাণ্ডারীর মনে সাম্প্রদায়িকতা জাগানো হতে পারে। কাণ্ডারীকে ওই সব বিষয় থেকে দূরে অবস্থান করে নিজের কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে এগিয়ে যেতে হবে। তাকে মনে রাখতে হবে সকল ধর্মের মানুষের একই পরিচয়। আর তা হল সবাই একই দেশমাতৃকার সন্তান। কখনো কখনো কাণ্ডারীকে ধরে শহিদের আত্মবলিদানের কথা মনে রাখতে হবে। কবির ভাষায়—“ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান আসি অলক্ষে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান।” ফাঁসির মঞ্চে যারা জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরী দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে অবিচল থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবেপ্রয়োজনে সংগ্রামে রত হয়ে----

‘মোদের চোখে বিশ্ববাসীর

স্বপ্ন দেখা হোক সফল।”

এই জন্যই কবি কাণ্ডারীকে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.