আমাদের ভাষা সংকট প্রশ্ন উত্তর BA 1st SEmester
১। আমাদের ভাষা সংকট প্রকৃতপক্ষে কোথায়? তার সমাধানে লেখক বলেছেন “বাঙালি যে দেহে সংকর, মনে সংকর, ভাষায় সংকর”— তার সত্যতা বিচার করো।
অথবা,প্রশ্ন : প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধে লেখক ইংরাজী ভাষার অনুপ্রবেশকে করেছেন কিভাবে? তিনি আমাদের ভাষা সংকট কিভাবে কাটিয়ে উঠতে হবে তা তাঁর নির্দেশিকা জ্ঞাপন করেছেন—আলোচনা কর।
উত্তর- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরী একজন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে বিরাজমান।বাংলা ভাষা একটি মিশ্রভাষা। তার কারণ বাংলা মৌখিক ভাষার বিশেষ্য, বিশেষণ বেশির ভাগই ইংরাজী, ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদের ক্ষেত্রে বাংলার স্পর্শ লক্ষ্য করা যায়। এই কারণেই প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন—“রাজমিস্ত্রি-ছুতোরমিস্ত্রিদের অধিকাংশ যন্ত্রপাতির নামের যে বিলেতে জন্ম তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই; কেননা মিস্ত্রি কথাটাই বিলেতি।” সুতরাং ইংরাজী শব্দগুলি বাংলা শব্দভাণ্ডারে তদ্ভব আকারে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
ফরাসি, পোর্তুগীজ, ওলন্দাজ, আলেমান, দিনেমার প্রভৃতি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের কাছ থেকে বাঙালিরা নিয়ে এসেছিল কেবল কর্মের ভাষা ও বিভিন্ন জিনিসপত্রাদির নাম। কিন্তু ইংরাজী ভাষা গোষ্ঠীর মানুষদের কাছ থেকে আমরা এই দুটি বিষয় ছাড়াও অতিরিক্ত আরও একটা জিনিস আত্মসাৎ করেছি, তা হল জ্ঞানের ভাষা। অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের নবাব পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনুপ্রেরণা হল ইংরাজী সাহিত্য। তাই প্রাবন্ধিক বলেছেন—“এ যুগে ইংরেজরা আমাদের অনেক জিনিস দিয়েছে, যা আমাদের ভাষার স্বনামেও আমাদের ঘরে স্বরূপে আছে ও থেকেও যাবে।” এমন কি পাশ্চাত্য রীতিসম্মত পঞ্চাঙ্ক নাটক, সাহিত্যিক মহাকাব্য, চতুর্দশপদী কবিতাবলী, পত্রকাব্য, অমিত্রাক্ষর ছন্দ—যা আমাদের সাহিত্যে আনয়ন করেছিলেন মধুসূদন দত্ত। কিন্তু এ
সবের প্রকৃত উৎসভূমি হল ইউরোপ। এমন কি উপন্যাস, গীতিকবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, রম্যরচনা বাঙালি বুদ্ধিজীবী মানুষেরা এসব কিছুর প্রথম সন্ধান পেয়েছিলেন পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকেই। সেইজন্য বোধহয় দেশ-ভাষার ঐতিহ্য-সচেতন প্রাবন্ধিক ভারতচন্দ্রের নবাবী আমলে প্রবেশ করে রাজসভার কবি-কথিত সমকালীন বাংলাদেশের বসবাসকারী ছয়টি বিদেশি জাতির উল্লেখ করে তাদের কথ্য ভাষার শ্রেণী পরিচয় দান করেছেন। তাই লেখকের অভিমত—“...বিদেশী শব্দকে স্বাদেশিক করা হচ্ছে আমাদের ভাষার চিরকালের স্বভাব।”
এ যুগে ইংরেজেরা আমাদের অনেক জিনিস দিয়েছে, যা আমাদের ভাষার স্বনাম ও আমাদের ঘরে স্বরূপে আছে ও থেকেও যাবে। একটা সর্বলোকবিদিত উদাহরণ দেওয়া যাক। বোতল গেলাস বাংলা ভাষা থেকে কখনও বেরিয়ে যাবে না, কেননা ও দুই চিজও বাংলাদেশ থেকেও কখনো বেরিয়ে যাবে না।” সুতরাং ইংরাজী জ্ঞানের ভাষা যদি কিছু পরিমাণে বাংলা ভাষার অন্তরঙ্গ হয়ে থাকে তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। যেহেতু দেশের জনগণ ইংরাজী ভাষায় শিক্ষিত নয়, সেজন্য এইসব ইংরাজী শব্দ স্বল্পসংখ্যক লোকের মুখেই শোনা যায়। তাই লেখকের অভিমত—“ইংরেজি শিক্ষার প্রসাদে অনেক নূতন জ্ঞান, অনেক নূতন ভাব আমাদের মনের ভিতর ঢুকে গিয়েছে, তাই তাদের বিলেতি নামও আমাদের মুখে মুখে চলেছে। যেহেতু দেশের জনগণ ইংরেজি-শিক্ষিত নয়, সে কারণ ঐ সব ইংরেজি কথা স্বল্পসংখ্যক লোকের মুখে শোনা যায়, আর তাদের বিদেশি ধ্বনি আমাদের কানে সহজেই ধরা পড়ে।”
#প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী ‘আমাদের ভাষা সংকট ' কাটিয়ে উঠার উপায় হিসাবে বলেছেন, বাংলা ভাষার মধ্যে বহু বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণ আছে। নির্ভেজাল বাংলা ভাষার কথা বা সাহিত্য রচনা করা এখন আর সম্ভব নয়। কেন না দেশশুদ্ধ লোকের ভাষা সংকর হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসক দল অনুপ্রবেশ করেছে এবং তাদের ভাষা আমাদের ভাষার সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। তাই বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় ফিরে যেতে হবে—যেটা সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির মনে ও ভাষাতে সংমিশ্রণ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে লেখকের উক্তি—“বাঙালি জাতি আমাদের সৃষ্টি করেছে, আমরা বাঙালি জাতিকে সৃষ্টি করিনি।” বাংলা ভাষার এই সংমিশ্রণের জন্য দুঃখ বা অনুশোচনা করে লাভ নেই। কেন না বাইরের জিনিসকে আত্মিকরণ করে নেওয়া প্রাণের ধর্ম। আমাদের বাংলা ভাষাও বহু বিদেশি ভাষার সমন্বয়ে একটি বলিষ্ঠ ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। তাই বাংলা ভাষা সম্পর্কে আমাদের যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তা কাটিয়ে উঠতে হবে।
Post a Comment